সব ব্যবসাই কি হালাল? জেনে নিন

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) দীনের কাজ শেষ করে রুটি রুজির জন্য সৎ পথে রোজগারের জন্য বলেছেন। রোজগারের হাজারো পথের মধ্যে ব্যবসাকে আল্লাহর রাসূল অধিক পছন্দ করতেন। তাই তো আমাদের সমাজ ও বিশ্বের সকল মুসলমানের বড় একটা অংশ ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো পৃথিবীতে হরেক রকমের ব্যবসা রয়েছে, কিন্তু সকল ব্যবসাই কি হালাল?

এ বিষয়ে বিস্তারীত ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো: ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি যে জাতি যত বেশি মনোযোগ দেয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সে জাতি তত বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। পক্ষান্তরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি যে জাতি বা যে অধিবাসীদের আগ্রহ নেই, তারা সব সময় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অন্যদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। তাই ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। তার ফজিলত ও বরকতের কথা শুনিয়েছে; ইহকালের কল্যাণ ও পরকালের সুসংবাদ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নামাজ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং মহান আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।’ (সূরা জুমা : ১০)।

এখানে অনুগ্রহের অর্থ জীবিকা ও সম্পদ। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি উৎসাহ দানের উদ্দেশ্যে মূলত আয়াতটি নাজিল হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মহানবী সা: ব্যবসায়ীদের অনুপ্রাণিত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা ব্যবসায় করো, ব্যবসায়ে ১০ ভাগের ৯ ভাগ রিজিকের ব্যবস্থা আছে।’ ব্যবসায়ের মূলনীতি : ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারস্পরিক কায়কারবারের বৈধতা ও সুষ্ঠুতা নিম্নলিখিত নীতিমালার ওপর নির্ভর করে। ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈধতা পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এ জন্য ব্যবসায়িক ব্যাপারে উভয় পক্ষের সহযোগিতা অবশ্যই থাকতে হবে। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘পুণ্য ও আল্লাহভীরুতার পথে একে অপরকে সাহায্য করো। পাপ ও অন্যায় পথে কখনো কারো সহযোগিতা করবে না।’ (সূরা মায়িদা : ২)।

যেকোনো কারবারে উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি অবশ্যই থাকতে হবে। জবরদস্তি সম্মতির কোনো মূল্য নেই। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ বাতিল পন্থায় খেও না। কিন্তু তা ব্যবসার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে হলে (কোনো আপত্তি নেই)।’ (সূরা নিসা : ২৯)। চুক্তি সম্পাদনকারীর মধ্যে যোগ্যতা থাকতে হবে। অর্থাৎ তাকে জ্ঞানী, প্রাপ্তবয়স্ক কিংবা বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন হতে হবে। সে অবুঝ, অপ্রাপ্তবয়স্ক, পাগল হতে পারবে না। মহানবী সা: বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির ওপর শরিয়তের বিধান আরোপিত হবে না- পাগল, ঘুমন্ত ব্যক্তি ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি।’ (আবু দাউদ)। কারবারে কোনো প্রকার প্রতারণা, আত্মসাৎ, ক্ষতি ও পাপাচার থাকতে পারবে না। অর্থাৎ ইসলামি শরিয়ত যেসব বস্তুর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে, সেসবের ব্যবহার করা যাবে না।

মহানবী সা: বলেছেন, (নিজে) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং (অন্যকে) ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়।’ ব্যবসার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় যাতে : নিচে বর্ণিত নীতিমালা ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যকে অসিদ্ধ ও বাতিল করে। যেমন : সম্পদ বাড়ানো ও মুনাফা অর্জনের এরূপ লেনদেন, যাতে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা থাকবে না। একজনের নির্ঘাত লোকসানের মাধ্যমে অপরের মুনাফা অর্জিত হবে। যেমন সর্বপ্রকার জুয়া ও লটারি। কারণ, একপক্ষের লাভ এবং অন্যপক্ষের নিশ্চিত লোকসানের ওপরই এসবের ভিত্তি রচিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে, আপনি বলে দিন এগুলোতে বিরাট পাপাচার রয়েছে।’ (সূরা বাকারা : ২১৯)।

সম্পদ বৃদ্ধি ও মুনাফা অর্জনের যেসব ব্যাপারে উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো এক পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি পাওয়া যায়নি, বিপাকে পড়ে এবং জবরদস্তি সম্মতিকেই স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি বলে ধরে নেয়া হয়েছে, যেমন সুদের কারবার কিংবা কোনো শ্রমিককে ঠকানো। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ বেচাকেনা (বৈধ ব্যবসায়) হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)। মহানবী সা: বলেছেন, ‘শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তোমরা তার মজুরি দাও।’ ইসলামের দৃষ্টিতে পাপ এমন কারবার করা অথবা এমন সব বস্তু কেনাবেচা করা, যা মূলত অপবিত্র। যেমন- মদ, মৃতদেহ, প্রতিমা, শূকর প্রভৃতি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের ওপর মৃতদেহ, রক্ত ও শূকরের মাংস হারাম করা হয়েছে।’ (সূরা মায়িদা : ৩)।

হজরত জাবির রা: বলেন, আমি মহানবী সা:কে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ মদ, মৃতদেহ, শূকর ও মূর্তি বেচাকেনা হারাম করেছেন।’ (নায়লুল আওতার, পঞ্চম খণ্ড)। উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরও যেসব লেনদেনে কলহবিবাদের আশঙ্কা থাকে। যেমন- পণ্য অথবা মূল্য কিংবা উভয়টাই অস্পষ্ট রাখা। কী দামে কেনা হলো কিংবা কী বস্তু কেনা হলো, তা স্পষ্ট করে বলা হলো না। অথবা একটা লেনদেনকে দুটোয় পরিণত করা হলো। যেমন যেসব পণ্য দেখা প্রয়োজন, কিন্তু না দেখেই ক্রয় করা হলো। মহানবী সা: বেচাকেনার সময় অনুপস্থিত বস্তু বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন (তিরমিজি)।

যেসব লেনদেনে ধোঁকা ও প্রতারণা নিহিত রয়েছে। যেমন- এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে অন্য ধরনের পণ্য দেয়া কিংবা বস্তার ভেতরে কমদামি পণ্য রেখে ওপরে দামি পণ্য সাজিয়ে রেখে ক্রেতাকে ধোঁকা দেয়া। মহানবী সা: প্রতারণামূলক লেনদেন নিষেধ করে বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ উপার্জন হতে হবে হালাল : প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্য হালাল রুজির সন্ধান করা অবশ্যকর্তব্য। কেননা হালাল সম্পদ বা খাদ্যই হলো ইবাদত কবুলের শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম শর্ত। হালাল উপায়ে অর্জিত ও শরিয়ত অনুমোদিত সম্পদ বা খাদ্য গ্রহণ ছাড়া আল্লাহর দরবারে কোনো ইবাদতই কবুল হবে না।

হালাল খাদ্য ভক্ষণ করা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসামগ্রী ভক্ষণ করো।’ (সূরা বাকারা : ১৬৮)। মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে মাংস হারাম খাদ্যে প্রতিপালিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর হারাম খাদ্যে বর্ধিত প্রতিটি মাংসপিণ্ড জাহান্নামেরই যোগ্য।’ (আহমদ, দারেমি, বায়হাকি)। উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহর রাসূল ব্যবসাকে অধিক গুরুত্ব দিলেও সকল ব্যবসাকে দেননি। বরং সৎ ও হালাল ব্যবসার কথাই তিনি বলেছেন। তাই আসুন আমরা ব্যবসার নামে যদি কোন অসৎ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকি তাহলে সেগুলো আজই ত্যাগ করি। ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৫/এমটিনিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published.