শিলালিপি মুড়ানো সেই মসজিদটি এখনো সুলতানি আমলের কথা কয়

হারিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের প্রাচীন নিদর্শনগুলো। অন্যতম প্রাচীন এ শহরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের কিছু নিদর্শন এখনও টিকে আছে। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এ স্মৃতিচিহ্নগুলোও একসময়ে হারিয়ে যাবে।

নৌ-বন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা চট্টগ্রামের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কিউরেটর ও গবেষক শামসুল হোসাইন বলেন, সবার আগে এ অঞ্চলের একটি পুরাতাত্ত্বিক জরিপ হওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীন নিদর্শন। এনিয়ে ব্যক্তিপর্যায়ে কিছু গবেষণা হলেও সরকারি পর্যায়ে বড় উদ্যোগ নেই।

ইতিহাসবিদদের মতে, এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনাগুলোর অন্যতম হল শহরের বদর আউলিয়ার দরগাহ। নগরীর বদরপাতি রোডে অবস্থিত। মাজারটি অন্তত ৭০০ বছরের পুরোনো। নগরীর পোস্তার পাড়ে রয়েছে হোসেন শাহের আমলের একটি শিলালিপি। পোস্তার পাড় জামে মসজিদটির দেয়ালে এ শিলালিপিটি বাঁধানো ছিলো। সেই মসজিদটি এখন আর নেই, তবে নতুন ইট-সিমেন্টের মসজিদের দেয়ালে শিলালিপিটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। মসজিদটির বিবর্তন নিয়ে জানতে চাইলে থানীয়রা জানান, চুন-সুরকির তৈরি মসজিদটি অনেক পুরোনো এবং জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় ২০০১ সালে সেটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।

এর আগে শিলালিপিটি মসজিদের পূর্ব অংশে আযান দেয়ার জন্য নির্মিত উঁচুস্থানের দেয়ালে রক্ষিত ছিলো। পুনর্নির্মাণের পর মসজিদের প্রবেশপথের দেয়ালের ওপর বাঁধানো হয়েছে। বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসে হোসেনশাহী আমল এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে এ আমল ছিল বাংলার স্বাধীন সালতানাতের খ্যাতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে। রাজ্যের সম্প্রসারণ, ধর্ম, সাহিত্য, শিল্পকলা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাত্পর্যময় অগ্রগতি হয়েছিল হোসেনশাহী শাসনামলে। এ আমলে বাংলায় স্থাপত্যের নমুনা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নির্বাচিত হন। চট্টগ্রাম ছিল তার রাজ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হোসেন শাহের রাজত্বের শেষদিকে পর্তুগীজ প্রতিনিধিদলও বাংলায় আসে।

সে সময়ে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি মসজিদগুলো আজো সুলতানি আমলের সাক্ষ্য বহন করছে। পরবর্তী সময়ে মোগল আমলেও অনেক স্থাপনা গড়ে ওঠে। সুলতানি আমলে নির্মাণ করা হাটহাজারীর জোবরা গ্রামের আলাওল মসজিদ, হাটহাজারীর নুসরত শাহ মসজিদ, মিরসরাইয়ের ছুটি খাঁর মসজিদ এ অঞ্চলের সুলতানি আমলের ইতিহাস বহন করছে। এর ইতিহাস নিয়ে ড. শামসুল হোসাইন জানান, জানা যায় জোবরা গ্রামের আলাওল মসজিদটি ১৪৫৯ থেকে ১৪৭৪ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছে। নুসরাত শাহ মসজিদটিও ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ সালের মধ্যে নির্মিত। তাছাড়া মিরসরাইয়ের পরাগপুল এলাকায় ছুটি খাঁর মসজিদটিও ১৫ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছে বলে জানা যায়। এগুলো বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের নিদর্শন। ১৬ শতাব্দীতে মোগলদের আগমনের পূর্বে এ অঞ্চলে পর্তুগীজদের প্রাধান্যও ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে অনেক পর্তুগীজ নিদর্শন হারিয়ে গেছে।

তবে বন্দর নগরীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে মোগল আমলের নিদর্শন। এরকম মোগল আমলের নিদর্শন রয়েছে নগরীর কদম মুবারক মসজিদে। একইসাথে বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র.)-এর পদচিহ্নও রক্ষিত রয়েছে। এ মসজিদের নিকটবর্তী লোকালয় কদম মুবারক নামে পরিচিত। গবেষক শামসুল হোসেন জানান, মুহম্মদ ইয়াসিন নামে এক স্থানীয় ফৌজদার মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহের শাসনামলে ১১৫৬ হিজরিতে (১৭২৩ খ্রি.) এ মসজিদ নির্মাণ করেন।

বর্তমানে কদম রসুল কমপ্লেক্সটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। চারিদিকে গড়ে ওঠা এসব অবকাঠামোর ফলে মূল মসজিদটি ঢাকা পড়েছে ইট-সিমেন্টের দেয়ালে। তবে বদর আউলিয়ার মাজার চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন ইমারত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ঐতিহাসিকদের কাছে। স্থানীয়দের কাছে তিনি বদর আলম, বদর পীর, বদর শাহ, বদর আউলিয়া প্রভৃতি নামে পরিচিত।

বদর পীরের চাটির (আলো জ্বালানোর ছোট প্রদীপ) কথা চট্টগ্রামে আজো কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, বদর শাহের (র.) চাটি থেকে চাটিগ্রাম হয়ে চট্টগ্রাম নামের উত্পত্তি। শামসুল হোসাইন জানান, মাজারটি অন্তত ৭০০ বছরের পুরোনো। মাজারের স্থাপত্যশৈলী দেখে বোঝা যায়, এটি পুরোপুরি সুলতানি আমলের।

১৩৩৮ সালে সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের বাংলা বিজয়ের পর অনেক সূফী সাধকরা এখানে এসেছিলেন। বদর আউলিয়ার আগমনও এ সময়ে ঘটেছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী বদর আউলিয়া একটি পাথরের কিস্তি চড়ে (নৌকা) চট্টগ্রাম এসেছিলেন। যে পাহাড়ের উপর তিনি প্রথম চাটি প্রজ্বলন করেছিলেন, সেটি বর্তমানে চেরাগীর পাহাড় নামে পরিচিত।
২০ ডিসেম্বর,২০১৫/এমটিনিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published.