বিবাহিত জীবনের সুখের রহস্য

“বিয়ে” শব্দটা মাত্র দুই অক্ষরের হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক বিস্তৃত, যার শিকড় রয়েছে আমাদের সমাজের খুবই গভীরে। এই বিয়ের মধ্য দিয়েই দুইজন নারী-পুরুষের এক সাথে পথ চলার শুরু হয়, তারপর চলতে হয় অনেকটা লম্বা পথ।

অনেক বিবাহিত দম্পতিই তাদের এই পথ চলায় পাশাপাশি থাকেন তাদের জীবনের শেষ পর্যন্ত, আবার অনেক দম্পতিরই চলার পথ আলাদা হয়ে বেঁকে যায় ভিন্ন দুই দিকে, ঘটে বিচ্ছেদ। আসলে কীভাবে দুইজন নর-নারী বিয়ের পর সারা জীবন একসাথে একটা সুখী জীবন কাটাতে পারে, এক সাথে প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করতে পারে?-এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা খুব সহজ না হলেও, অসম্ভব নয় একেবারেই।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিয়ে হচ্ছে দুইজন মানুষের একসাথে থাকার ইচ্ছার পরিণতি, যেখানে হয়তো পরস্পরের জন্য উভয়ের মধ্যেই অনেক রোমান্টিকতা ও আকর্ষণ কাজ করছে। কিন্তু বিয়ের পরেই আসলে তাদের একসাথে থাকার দীর্ঘপথ চলা শুরু হয়। এই দীর্ঘপথ চলায় যদি কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখা যায়, তাহলে শুরুর দিকের সেই রোমান্টিকতা, পরস্পরের প্রতি প্রেম-ভালবাসা টিকিয়ে রাখা যায় আজীবন। এমনকি আপনার চোখে দেখা পৃথিবী সেরা দম্পতির সম্পর্কও টিকে থাকার পিছনে রয়েছে পরস্পরের প্রতি মনযোগ, যত্ন এবং অনেক প্রচেষ্টা।

পাঁচটি বিষয়ের দিকে নজর দিলে একটা সফল বিয়ে থেকে একটি সফল দম্পতির গল্প পাওয়া সম্ভবঃ

১। পারস্পরিক বোঝাপড়াঃ

সফল দাম্পত্য জীবনের একেবারে মূলে রয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়া। সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঙ্গীর কাছ থেকে নিজে কী পেলাম-শুধু তা না ভেবে, নিজের সঙ্গীকে নিজে কী দিতে পারলাম-সে দিকেও নজর দিন। কারও যদি মনে হয় তার নিজের যতোটুকু দেওয়া উচিত, সে নিজে ততোটুকু দিচ্ছেন না অথবা কেউ যদি ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ হন এই ভেবে যে, তিনি নিজে শুধু দিয়েই যাচ্ছেন, কিছুই পাচ্ছেন না, তাহলে তা একটি অসম সম্পর্কেরই ইঙ্গিত দেয়।

অনেক দম্পতিই এটা ভাবেন যে, তারা ভালবাসা দিয়েই সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবেন এবং তার সঙ্গী যদি তাকে সত্যিকার অর্থে ভালবেসে থাকে, তাহলে তিনি যা বলবেন- তার সঙ্গী তাই করবেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, প্রত্যেকটা মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং চাহিদা আলাদা। আমরা যদি ভাবি যে, আমি কারও সাথে সারা জীবন একসাথে কাটাতে চাই, তার মানে এই নয় যে আমরা আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলব অথবা ত্যাগ করব।

২। খোলামনে পারস্পরিক আলোচনাঃ
মনে রাখতে হবে, ছুরির আঘাতে সম্পর্কের মৃত্যু ঘটে না, সম্পর্কের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করে পারস্পরিক আলোচনার পরিমাণের উপর। একটি বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী যদি নিজেদের ভেতরকার কথা নিজেদের মধ্যে খোলামনে পরস্পরের কাছে বলার পথ খুঁজে না পান, তাহলে সে বিবাহিত জীবন ভালবাসার বদলে তিক্ততায় ভরে উঠতে সময় লাগবে না। বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী দুইজনকে অবশ্যই নিজের মধ্যে সরাসরি খোলামনে কথা বলতে হবে এবং অবশ্যই তা হতে হবে নিয়মিত।

এর মানে এই নয় যে, স্বামী-স্ত্রীর কেউ একজন সুযোগের অপেক্ষায় থাকবেন, সুযোগ পেলেই তিনি জানিয়ে দিবেন, তার সঙ্গীর কোন একটা ব্যাপারে তিনি কতোটা বিরক্ত। এর অর্থ এই যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কারও একজনের মনে যদি কোন অভিযোগ থেকেও থাকে তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন, তবে তা পারস্পরিক সম্মানটা ধরে রেখেই।

৩। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও লড়াইয়ের বিষয় নির্ধারণ করুনঃ
বিয়ের পরে যখন দুইজন মানুষ একসাথে থাকা শুরু করে, তখন তারা দুইজনই এটা ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে শুরু করে যে, তাদের মধ্যে যতোই ভালবাসা ও আকর্ষণ কাজ করুক না কেন, তারা দুইজন একদম দুটি আলাদা মানুষ এবং ভিন্ন একজন মানুষের সাথে দিনের পর দিন একসাথে কাটানো সহজ কোন ব্যাপার নয়।

তাই বিবাহিত দম্পতির মাঝে কথা কাটা-কাটি, হালকা মনোমালিন্য, ঝগড়া তো হবেই। তবে নিজেকে প্রস্তুত করুন সিদ্ধান্ত নিতে যে, আপনার সঙ্গীর সাথে কী বিষয়ে তর্কে জড়াবেন, বোঝাপড়া করার চেষ্টা করবেন। আপনি কি সামান্য টুথপেস্ট ক্যাপ না লাগানো বা জুতাটা জায়গা মত না রাখা- এসব সামান্য বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়বেন? নাকি আপনি নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সন্তান লালন-পালন, অথবা নিজেদের ক্যারিয়ার জীবন- এসব নিয়ে লড়াই করতে নিজের মানসিক শক্তি সঞ্চয় করবেন? বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, বেশির ভাগ দম্পতিই খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে থাকেন।

৪। নিজের প্রয়োজনকে লুকাবেন নাঃ
যখন একজন মানুষ একটি বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ পথে প্রবেশ করে, তখন অনেকেই নিজের প্রয়োজনকে নিজের সঙ্গীর প্রয়োজন ও চাহিদার আড়ালে হারিয়ে ফেলেন। তিনি হয়তো সন্তান নেওয়া বা সন্তানের লালন-পালন, নিজের সঙ্গীর ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে এক শহর ছেড়ে অন্য শহরে যেতে রাজি হয়ে যান সহজেই। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তার আগে একজন মানুষকে এটা বুঝতে হবে, যে বিষয়গুলোর জন্য তিনি ছাড় দিচ্ছেন, তা আসলেই তার নিজের কাছে কতটুকু গুরুত্ব বহন করে। যদি সত্যিই বিষয়গুলো তার কাছে গুরুত্ব বহন করে, তাহলে নিজের সঙ্গীর সাথে তার কথা বলা উচিত এবং যতটুকু সম্ভব ততোটুকু ছাড় দেওয়া উচিত। কিন্তু সেই ছাড়টুকু দেওয়ার সময় নিজের চাহিদা এবং প্রয়োজনটুকুও নিজের সঙ্গীর কাছে তুলে ধরতে হবে।

অর্থাৎ নিজের সঙ্গীর জন্য ছাড় দিন, কিন্তু তা নিজের প্রয়োজনকে একেবারে ভুলে গিয়ে নয়। কারণ তা যে কোন দাম্পত্য জীবনের জন্য দীর্ঘ সময়ের পথ চলায় ক্ষতিকারক।

৫। সততা এবং বিশ্বস্ততাঃ
এক একজন মানুষ তার সঙ্গীর কাছে কী চায়, সেটা এক একরকম। কিন্তু প্রায় প্রত্যেকেই তার সঙ্গীর কাছে সততা এবং বিশ্বস্ততা- এই দুইটি বিষয় আশা করে এবং এই চাওয়াটাকেই সব থকে গুরুত্ব দেয়। কারণ, একজন সঙ্গী হচ্ছে সেই মানুষটি, যার ওপর তার অপর সঙ্গী নির্দ্বিধায় এবং কোন সংশয় ছাড়াই নির্ভর করতে চায় এবং তা অনেক দিনের জন্যই।

তবে সঙ্গীর ছোট কোন ভুলের জন্য বিবাহিত জীবনের সম্পর্ক যেন একেবারে ভেঙ্গে না যায়, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তার থেকে বরং বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েগুলোর দিকে নজর দিন। যেমনঃ কেউ বিয়ের আগে বলল, সে কোন একটি বড় প্রতিষ্ঠানে ইঞ্জিনিয়ার পদে কর্মরত, কিন্তু সে হয়তো ইঞ্জিনিয়ারিং কখনো পাশই করেনি।

একটি সুন্দর ও শক্তিশালী বিবাহিত জীবন হচ্ছে অনেকটা সুন্দর আলাপচারিতার মত, যেখানে একে অপরের প্রশংসা করে, একে অপরকে বিশ্বাস করে, একে অপরকে আগলে রাখে। যে আলাপচারিতার বিষয় প্রতিনিয়ত পরিবর্তীত হয়। আপনাকে সঙ্গীর কথা শোনার সাথে সাথে নিজেও কথা বলতে হবে, সঙ্গী কী বলছে তার দিকে মনযোগী হতে হবে।

এমন ব্যাপার নয় যে, বিয়ে হয়ে গেল আর এই “বিয়ে হয়ে যাওয়াটাই” সবকিছুর শেষ। প্রকৃতপক্ষে বিয়ের পরেই জীবনের একটা লম্বা অধ্যায়ের শুরু হয়, যেখানে একজনকে প্রতিনিয়ত শেখার চেষ্টা করতে হয়- কীভাবে খোলামনে এবং সততার সাথে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগটা আরও শক্তিশালী করা যায় এবং তা অবশ্যই হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ ধরে রেখেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!